কারমিয়ান গুচ
1,621,500 views • 14:27

যখন আমরা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলি, তখন কিছু বিশেষ টাইপের ব্যক্তিদের কথা মনে পরে।

যেমন ভূতপূর্ব সোভিয়েতের ক্ষমতা পাগলরা। সাপারমুরাত নিয়াযভ, এদের মধ্যে একজন। ২০০৬ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত, তিনি তুর্কেমিনস্তান এর সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসক ছিলেন, যেটা মধ্য এশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ একটা দেশ। তিনি রাষ্ট্রীয় ফতোয়া জারি করতে খুব ভালবাসতেন। এবং একটায় মাসের নাম বদলে নতুন নামকরণ হয়েছে তার নিজের নাম এবং তার মা'র নাম অনুসারে । তিনি লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করতেন এক উদ্ভট ব্যক্তিত্বকে জনপ্রিয় করার জন্য, এবং তার চরম গৌরব ছিল সেই বিল্ডিং যা কি না ৪০ ফুট উঁচু সোনার পাত দিয়ে মোড়া তার নিজের মূর্তি, যা রাজধানীর মুখ্য চত্বরে সদম্ভে দাঁড়িয়ে সূর্যকে অনুসরণ করে ঘুরতে থাকতো। সে একটু অস্বাভাবিক ধরনের ব্যক্তি ছিল।

আর আছে সেই অতি আলোচিত আফ্রিকান স্বৈরশাসক অথবা মন্ত্রী অথবা সরকারী কর্মকর্তা। টেওডোরিন ওবায়াং। তার বাবা ছিলেন ইকোইটোরিয়াল গিনির আজীবনের জন্য নিযুক্ত প্রেসিডেন্ট, এটা পূর্ব আফ্রিকার একটা দেশ যা ১৯৯০ সাল থেকে লক্ষ্য লক্ষ্য ডলার এর তেল রপ্তানি করেছে যদিও এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস ভয়াবহ। এর অধিকাংশ মানুষই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে যদিও এর মাথা পিছু আয়ের পরিমাণ পর্তুগালের সমান। তো ওবিয়াং জুনিয়র কি করলেন ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যালিবুতে একটি ৩০ মিলিয়ন ডলার এর বিলাসবহুল বাড়ী কিনলেন। আমার বাড়িটার সদর দরজা পর্যন্ত গেছিলাম। আমি আপনাদের বলতে পারি ওটা একটা জাঁকালো বাড়ি। উনি ১৮ মিলিয়ন ইউরোর শিল্প সংগ্রহ কিনেছেন ইভস সেন্ট লরেন্ট নামের একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এর থেকে, এক গাদা চমৎকার স্পোর্টস গাড়ী, যার একেকটার দাম মিলিয়ন ডলার— আর হ্যাঁ,এবং একটা গালফস্ট্রিম জেট ও। এখন ঘটনা হল: এই কিছু দিন আগে পর্যন্ত উনি সরকারী বেতনই আয় করতেন যা ৭০০০ ডলার এরও কম।

আর আছেন ড্যান এতেত। উনি নাইজেরিয়ার প্রাক্তন খনিজ তেলের মন্ত্রী ছিলেন প্রেসিডেন্ট আবাচার সময়ে, এবং দেখা গিয়েছিল যে,উনি টাকার অবৈধ লেনদেনের এর সাথেও জড়িত ছিলেন। আমরা অনেকটা সময় খরচ করেছি ১ বিলিয়ন ডলার নিয়ে তদন্ত করতে— সত্যি বলছি,পুরো ১ বিলিয়ন ডলারের— তেলের লেনদেন যার সাথে উনি জড়িত ছিলেন, এবং আমরা যা জানতে পারলাম তা খুবই জঘন্য, কিন্তু সে সম্পর্কে আরও কথা পরে হবে।

তো এটা ধরে নেওয়া খুবই স্বাভাবিক যে দুর্নীতি ঘটে অন্য জায়গায় কোথাও, কিছু স্বৈরাচারী লোভী মানুষ এবং কিছু অসৎ ব্যক্তি যা ঘটায় অন্য কোন দেশে যার সম্পর্কে ব্যক্তিগত ভাবে আমরা খুব কম জানি আর নিজেদের সেটার থেকে বিযুক্ত মনে করি আর এর কোন প্রভাব অনুভব করি না। কিন্তু সত্যিই কি এসব অন্য কোথাও হয়?

হুম,যখন আমি ২২ বছরের ছিলাম,আমার কপাল খুবই ভাল ছিল। আমার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কাজটা ছিল আফ্রিকান আইভরিতে অবৈধ ব্যবসা নিয়ে তদন্ত করা। এবং এভাবেই আমার দুর্নীতির সাথে সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৯৩ সালে আমি আর আমার দুই বন্ধু সাইমন টাইলর এবং পেত্রিক এলেই, গ্লোবাল উইটনেস নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনা করি। আমাদের প্রথম প্রচারাভিযান শুরু হয় কম্বোডিয়ার যুদ্ধের তহবিলের গোঁজামিল নিয়ে।

তো কিছু বছর পরে, ১৯৯৭ সালে, আমি তখন অ্যাঙ্গোলায় গোপনে ব্লাড ডায়মন্ড নিয়ে তদন্ত করছি। আমার মনে হয় আপনারা সবাই সিনেমাটা দেখেছেন, হলিউড এর ছবি "ব্লাড ডায়মন্ড", যাতে মুল অভিনেতা থাকেন লেওনারদো ডিক্যাপ্রিও। উম্, আমাদের কাজের মাধ্যমে কিছু তথ্য সামনে এলো। লন্ডা, যেখানে প্রচুর ব্যক্তি ল্যান্ড মাইনের শিকার হয়েছিল যারা রাস্তায় থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিল আর যুদ্ধে অনাথ হওয়া শিশুরা রাস্তার নীচে নর্দমায় থাকছিল, এবং সংখ্যায় খুব কম,খুবই ধনী উচ্চবিত্ত কিছু মানুষ যারা সবসময় আলোচনা করতো ব্রাজিল এবং পর্তুগাল এ কেনাকাটি করতে যাওয়ার। এবং এটা ছিল একটা অদ্ভুত জায়গা।

তো আমি একটা গরম আর বদ্ধ হোটেল রুম এ বসে আছি খুবই কাতর অবস্থায়। কিন্তু এই ব্যাপারটা ব্লাড ডায়মন্ড নিয়ে ছিল না। কারণ আমি ওইখানের অনেকের সাথে কথা বলেছি যারা কিনা একটা অন্য সমস্যার কথা বলল: যেটা কিনা একটা বিশাল আর আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাপ্ত দুর্নীতির চক্র যাতে লাখ লাখ তেলের ডলার গায়েব হয়ে যাচ্ছে, এবং যেটা কিনা সেই সময়ে খুবই ছোট একটা প্রতিষ্ঠান ছিল খুব কম লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ , সেটা এতো বিশাল ব্যাপারের মোকাবিলা কিভাবে করবে সেটা ভাবাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আর যেই দিনগুলোতে আমি, এবং আমরা সকলেই যারা প্রচার এবং তদন্ত করছিলাম, বারংবার একটা জিনিস দেখলাম যে কিভাবে দুর্নীতি বিশ্বজুড়ে, অনেক বড় আকারে ঘটা সম্ভব হয়, আসলে এইটা শুধু লোভ অথবা ক্ষমতার অপব্যবহার নয় অথবা আমরা যে অস্পষ্ট কথাটা বলি, " দুর্বল শাসনকার্য", সেটা নয়। আমি বলতে চাইছি যে নিশ্চয়ই এগুলো সবই থাকে কিন্তু দুর্নীতি আসলে সম্ভব হয় বিশ্বজুড়ে কিছু সাহায্যকারীদের ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে।

তো এখন ফিরে যাওয়া যাক সেই মানুষদের কথায় যাদের কথা আমি একটু আগে বলেছিলাম। এখন,তাদের প্রত্যেককে আমরা তদন্ত করেছি, এবং তারা নিজেরা একা এই কাজগুলো করার ক্ষমতা রাখেন না। যেমন ধরুন ওবিয়াং জুনিয়রের কথা। তিনি অন্যের সাহায্য ছাড়া কখনই বিলাসবহুল বাড়ি এবং নামি-দামি শিল্প সংগ্রহের মালিক হতে পারতেন না। তিনি আন্তর্জাতিক বহু ব্যাঙ্কের সঙ্গে ব্যবসা করতেন। প্যারিস এর একটি ব্যাংকে ওনার পরিচালনাধীন কোম্পানির অ্যাকাউন্ট ছিল, যার একটার মাধ্যমে শিল্পদ্রব্যের কেনা বেচা চলত, এবং আমেরিকান ব্যাংকগুলো, অবৈধভাবে ৭৩ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রে এ নিয়ে আসে, যার কিছু ওই ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়িটি কেনার জন্য ব্যয় করা হয়েছিল। এবং সে এই সবকিছুতে তার নিজের নামে করেনি। সে ভুয়ো কোম্পানির নাম ব্যবহার করেছে। সে একটা নাম ব্যবহার করেছে সম্পত্তি কেনার জন্য,এবং আরেকটা, যেটা আরেকজনের নামে ছিল, সেটা ওই সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল খরচ চালানোর জন্য।

আর আছেন ড্যান এতেত। তিনি যখন তেল মন্ত্রী ছিলেন, তিনি একটি তেল এর ব্লক, যার মূল্য এখন বিলিয়ন ডলারের বেশী, উপহার দিয়েছিলেন একটা কোম্পানিকে, আর আন্দাজ করুন তো, হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন তিনি নিজেই এইটার গোপনে মালিক ছিলেন। এখন, এর অনেক পরে এটার হাতবদল ঘটে নাইজেরিয়ান সরকার এর দাক্ষিণ্যে— এবার আমাকে কি বলছি সেটা নিয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে —- শেল এবং ইতালিয়ান এনি-র অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে, যা সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানিদের মধ্যে দুটি।

তো সত্যিকার অর্থে, দুর্নীতির যে মূল ইঞ্জিন তার ব্যাপ্তি ইকোইটোরিয়াল গিনি অথবা নাইজেরিয়া অথবা তুরকেমেনিস্তানের মত দেশের সীমানার তুলনায় অনেক বেশী। এই ইঞ্জিন আসলে আমাদের আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং সিস্টেম দ্বারা চালিত হয়, যার মূলে আছে নামহীন ভুয়ো কোম্পানির সমস্যা, এবং যে গোপনীয়তা আমরা বজায় রাখি বড় বড় তেল,গ্যাস এবং খনন কাজের জন্য, এবং, সবচেয়ে বড় কারণ হল, আমাদের রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা কারণ তারা নিজেদের বাগাড়ম্বরকে গুরুত্ব দিতে অথবা অর্থপূর্ণ ও সুসম্বন্ধ প্রণালীতে এর মোকাবিলা করতে পারে না।

এখন সবার শুরুতে ব্যাংকগুলোকে ধরা যাক , উম্ম, আমি এটা আপনাদের বললে আপনারা কেউ আশ্চর্য হবেন না যে ব্যাংক কালো টাকা গ্রহণ করে, কিন্তু তারা তাদের লাভকে প্রাধান্য দেয় অন্যান্য আরও ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থেকে। যেমন ধরুন, মালায়শিয়ার সারাওয়াক এ। এই অঞ্চলে, বনভূমির মাত্র ৫ শতাংশ বেঁচে আছে। মাত্র ৫ শতাংশ। তো এটা কীভাবে সম্ভব? আসলে এর কারণ হল ক্ষমতাভোগীদের একটা দল আর তাদের পৃষ্ঠপোষকরা যারা লাখ লাখ ডলার আয় করছে ব্যাপক হারে গাছ কাটার কারবারকে সমর্থন করে বহু বছর ধরে। তো আমরা গোপনে তদন্ত করতে একজন তদন্তকারী পাঠালাম যে লুকিয়ে এই ক্ষমতাভোগী শাসকশ্রেণীদের মিটিং গোপনে ভিডিও করবে আর ওই ফুটেজে যা দেখা গেল তা কিছু লোককে খুবই রাগান্বিত করেছে, এবং আপনারা ইউ টিউব এ ভিডিওটি দেখতে পারেন, কিন্তু এর মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে, যা কিনা আমরা দীর্ঘদিন যাবত সন্দেহ করে আসছি, এটা দেখায় যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কিভাবে, পরবর্তী কালে তার অস্বীকার করা সত্ত্বেও, তার নিয়ন্ত্রণাধীন ভূমি এবং বন এর লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন নিজের এবং তার পরিবারের সম্পত্তির বৃদ্ধি ঘটানোর জন্য। এবং HSBC, আসলে আমরা জানি যে HSBC টাকা যোগান দিয়েছিল অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কাঠকাটার কোম্পানিকে যারা কিনা সারাওয়াক এবং অন্যত্র অরণ্য বিনাশের জন্য দায়ী ছিল। যদিও এটা করতে গিয়ে ব্যাংক তাদের নিজেদের স্থায়িত্বের নীতি লঙ্ঘন করেছিল, কিন্তু এটি ১৩০ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছে। এখন আমরা সব দুষ্কর্মের কথা ফাঁস করার একটু পরেই, এই বছরের শুরুর দিকে সব দুষ্কর্মের কথা প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ব্যাংক তাদের নীতি পর্যালোচনা করার ঘোষণা দিল। আর এটা কে কি উন্নতি বলা যায় ? হতে পারে, কিন্তু আমরা খুবই কড়া নজরদারির মধ্যে রাখব ঘটনাটা।

এবং তারপর ঐদিকে আবার অজ্ঞাতনামা ভুয়ো কোম্পানির সমস্যা তো আছেই। আমার মনে হয় আমরা সবাই শুনেছি এগুলোর কথা, এবং আমরা সবাই জানি যে তাদের সেই লোকেরা আর কোম্পানিরা ব্যবহার করে যারা তাদের প্রতি সমাজের যা ন্যায্য প্রাপ্য সেটা এড়াতে চায়, সহজ কথায় বললে একে ট্যাক্স বলা হয়। কিন্তু আসলে যে জিনিসটা পর্দার আড়ালে থেকে যায় সেটা হল শেল কোম্পানিগুলো কিভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ চুরি করত, যে অর্থ সমাজের পরিবর্তন আনতে সক্ষম গরিব দেশ গুলোতে। বস্তুত আমরা যে দুর্নীতির বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করেছি, তার প্রত্যেকটায় ভুয়ো কোম্পানির নাম উঠে এসেছে, এবং মাঝেমধ্যে এটা বের করা দূরহ হয়ে দাঁড়ায় যে কারা এই কাণ্ডে আসলে জড়িত।

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর একটি গবেষণায় ২০০ টি দুর্নীতির ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। দেখা যায় যে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে অজ্ঞাতনামা শেল কোম্পানির নাম ব্যাবহার করা হয়েছে, যার সবমিলিয়ে মূল্য প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলার। এখন এর মধ্যে বহু কোম্পানি ছিল আমেরিকা অথবা গ্রেট ব্রিটেন, আর এর বিদেশী অঞ্চল এবং উপনিবেশ গুলোর, এবং তো এটি শুধু দেশের বাইরের সমস্যা নয়, এটি দেশের সমস্যাও বটে। তাহলে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, শেল কোম্পানিগুলোই গোপন চুক্তিগুলোর কেন্দ্রে থাকে যা কিনা সমাজের উচ্চবিত্তদের উপকারে লাগে সাধারণ মানুষদের কোন লাভ হয় না ।

সাম্প্রতিক কালে আমরা একটি চমকপ্রদ ঘটনার তদন্ত করেছি যে কিভাবে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো-র সরকার মূল্যবান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খনি ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপ এর শেল কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়। তো আমরা ওই দেশে আমাদের তথ্য সরবরাহকারী লোকেদের সঙ্গে কথা বললাম,, কোম্পানির সব নথিপত্র এবং অন্যান্য তথ্যাদি খুঁটিয়ে দেখলাম পুরা ছবিটা জোড়া লাগানোর জন্য। এবং আমরা এটা দেখে ত্রস্ত হলাম যে এই শেল কোম্পানিগুলো খুব তাড়াতাড়ি তাদের সম্পত্তি মুনাফার লোভে লন্ডনের খুব বড় আন্তর্জাতিক খনন কোম্পানিকে বেচে দিয়েছে। এখন, কফি আন্নান এর নেতৃত্বাধীন, আফ্রিকা প্রোগ্রেস প্যানেল হিসাব নিকাশ করে দেখেছে যে এই লেনদেনের কারণে কঙ্গো-র প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার এর মতন লোকসান হয়েছে । এটা দেশটির বার্ষিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা খাতের বাজেটের প্রায় দিগুণ। এবং কঙ্গোর নাগরিকরা, তারা কি তাদের অর্থ কোনোদিন ফিরে পাবে? বলতে গেলে, এই প্রশ্নের, আর কে এইটার সাথে জড়িত ছিল এবং আসলে কি হয়েছিল, এই সব প্রশ্নের উত্তর তালা বন্ধ হয়ে থাকবে ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপের গোপন কোম্পানির গোপন নথির মধ্যে বা অন্য কোথাও যদি না আমরা সবাই এটা নিয়ে কিছু করি।

আর তেল, গ্যাস এবং খনন কোম্পানিগুলো ধরা যাক, আচ্ছা, এদের ব্যাপারে কথা বলা ক্লিশে মনে হতে পারে। ওই বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সব জায়গায় দুর্নীতি আছে, তাহলে শুধু ওই বিভাগ নিয়ে মাথা ঘামান কেন? উম্ম, কারণ এখানে হারানোর ভয় অনেক বেশী। ২০১১ সালে, প্রাকৃতিক খনিজ রপ্তানি মূল্য সাহায্যের জন্য দেওয়া অর্থের মোট পরিমাণ থেকে প্রায় ১৯ গুণ বেশী ছিল আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকায়। ১৯ গুণ। এখন এই টাকায় প্রচুর বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় আর হাসপাতাল এবং ব্যবসা শুরু করা যায়, যার অনেকগুলো তৈরি হয়নি আর কোনোদিন তৈরিও হবে না কারণ এই টাকার অনেকটাই চুরি হয়ে গেছে।

এখন ফিরে যাওয়া যাক তেল এবং খনন কোম্পানিগুলোর কথায়, এবং ফিরে যাই ড্যান এতেত এবং সেই ১ বিলিয়ন ডলার এর চুক্তির কথায়। এবং আমাকে মাফ করবেন কারণ পরের অংশটা আমি পড়ে শোনাবো কারণ এইটা একটি ঘটমান বিষয়, এবং আমাদের আইনজীবীরা এই বিষয়টা নিয়ে তলিয়ে দেখেছে এবং তারা চায় যে আমি এটা সঠিক ভাবে বলি ।

এখন, আপাতভাবে চুক্তিটি বেশ সিধে মনে হয়। এই ব্লকটির জন্য শেল এবং এনি এর অধীনস্থ কোম্পানি নাইজেরিয়ান সরকার কে টাকা দিয়েছে। নাইজেরিয়ান সরকার ঠিক সেই পরিমাণ অর্থ, এক ডলারেরও এদিক ওদিক না করে একটা ভুয়ো কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছে যে কোম্পানির গোপনে মালিক হল এতেত। এখন, একজন অর্থ কেলেঙ্কারি অপরাধীর জন্য এটা খারাপ কিছু না কিন্তু কথা হল, মাসের পর মাস তদন্ত করে এবং শত শত কোর্ট এর দলিল পড়ার পর, আমরা প্রমাণ পেলাম যে আসলে শেল এবং এনি অনেক আগে থেকেই জানত যে ফান্ড এর সব টাকা ভুয়ো কোম্পানিতে স্থানান্তরিত হবে, এবং সত্যি কথা বলতে, এটা বিশ্বাসজনক নয় যে তারা জানত না যে কাদের সাথে তারা চুক্তিটা করছে।

এখন, এই ধরনের চুক্তি করে সব টাকা কোথায় গেল তা বের করার জন্য এই ধরনের কঠোর প্রচেষ্টার প্রয়োজন হওয়া উচিৎ না। আমি বলতে চাইছি, এগুলো রাষ্ট্রের সম্পদ। এগুলো রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের উপকারের জন্য ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু কোন কোন দেশে, নাগরিক ও সাংবাদিকরা যারা এই ধরনের সংবাদ প্রকাশ করেন তাদের হয়রানি ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কয়েকজন তাদের জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছেন এই কাজ করার জন্য।

এবং সব শেষে, এমনও কিছু মানুষ আছেন আছে যারা বিশ্বাস করেন যে দুর্নীতি অপরিহার্য। এভাবেই কিছু ব্যবসা করা হয়। এটি পরিবর্তন করা অত্যন্ত জটিল এবং কষ্টকর। তো এর পরিনাম কি? আমরা এটা মাথা পেতে মেনে নিই। কিন্তু একজন প্রচারক এবং তদন্তকারী হিসেবে, প্রবীণ সৈনিক আমার দৃষ্টিভঙ্গি অন্যরকম, কারন আমি দেখেছি এটা দ্রুতগতিতে এগোলে তার পরিণাম কি হতে পারে। তেল এবং খনি শিল্পের কথাই ধরুন, এখন পুরো বিশ্বব্যাপী নতুন স্বচ্ছতার মানদণ্ড তৈরি হচ্ছে যা কিনা এই ধরনের কিছু সমস্যা মোকাবিলা করতে পারবে। ১৯৯৯ সালে, যখন গ্লোবাল উইটনেস তেল কোম্পানিগুলোকে তাদের লেনদেন স্বচ্ছ করতে আহ্বান জানিয়েছিল, কিছু কিছু মানুষ এই চিন্তাধারার চরম সরলতা নিয়ে উপহাস করেছিল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে পৃথিবীর সব জায়গা থেকে শত শত সুশীল সমাজ গোষ্ঠী একসাথে মিলে যুদ্ধ করছে স্বচ্ছতার পক্ষে, এবং এখন তা ক্রমেই প্রথা ও আইনে পরিনত হচ্ছে। পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ তেল এবং খনির কোম্পানিগুলো এখন স্বচ্ছতা আইনের আওতাভুক্ত। দুই তৃতীয়াংশ।

তো পরিবর্তন ঘটছে। এটাই অগ্রগতি। কিন্তু আমরা এখনো সেখানে পৌছতে পারিনি,অনেক দূরে এখনো। কারণ এটা শুধু ওই ওখানে কোথাও যে দুর্নীতি ঘটছে সেটার প্রশ্ন নয়, তাই তো? বিশ্বায়নের এই যুগে,দুর্নীতি একটা পৃথিবী ব্যাপী কারবার, এবং যার জন্য প্রয়োজন পৃথিবী ব্যাপী সমাধান, যাকে আমাদের সকলকে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে সমর্থন ও কায়েম করতে হবে, এখানেই।

ধন্যবাদ।

(হাততালি)