আমি মস্তিস্ক নিয়ে পড়াশোনা করার জন্যই বড় হয়েছিলাম কারণ আমার ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিল: সিজোফ্রেনিয়া। আর তার বোন হিসেবে ও পরে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে, আমি বুঝতে চেয়েছিলাম যে কেন আমি স্বপ্ন দেখতে পারি, আমার স্বপ্নগুলোকে মেলাতে পারি বাস্তবের সঙ্গে, এবং কিভাবে আমি আমার স্বপ্নগুলোকে সতি্য করতে সমর্থ হই? আর আমার ভাইয়ের মস্তিস্ক আর তার সিজোফ্রেনিয়ায় কী আছে যে, সে তার স্বপ্নগুলো মেলাতে পারে না একটা সর্বজনগ্রাহ্য বাস্তবতার সঙ্গে, বরং সেগুলো ভ্রমে পরিণত হয়?
তাই আমি আমার পেশাগত জীবনকে উৎসর্গ করেছি গবেষণায় গুরুতর মানসিক ব্যাধিগুলো নিয়ে। আর আমার দেশের বাড়ি ছেড়ে পাড়ি জমালাম ইন্ডিয়ানা থেকে বোস্টনে, ওখানে আমি কাজ করা শুরু করলাম হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের, প্রফেসর ড. ফ্রান্সাইন বেনেসের গবেষণাগারে মনোবিজ্ঞান বিভাগে। আর ঐ গবেষনাগারে আমরা প্রশ্ন তুলছিলাম যে, "বিভিন্ন ব্যক্তিদের মস্তিস্কের মধ্যে জৈব পার্থক্যটা কী যাদেরকে স্বাভাবিক মানুষ বলে বিবেচনা করা হয় তাদের তুলনায় সেইসব মানুষের মস্তিস্কের পার্থক্যটা কী যাদেরকে চিহ্নিত করা হচ্ছে সিজোফ্রেনিয়া, সিজোএফেক্টিভ বা বাইপোলার ডিসঅর্ডার রোগী হিসেবে?"
তো উত্তরের খোঁজে আমরা মস্তিস্কের সুক্ষ-সার্কিটগুলো সনাক্ত করছিলাম। মস্তিষ্কের কোন কোষটা কোন কোষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে কোন কোন রাসায়নিক পদার্থ এখানে যুক্ত হচ্ছে কী পরিমাণে যুক্ত হচ্ছে? তো আমার জীবনটা অনেক অর্থবহ হয়ে উঠেছিল কারণ সারাদিন আমি এই ধরণের গবেষনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম এরপর সন্ধ্যায় ও সপ্তাহিক ছুটিতে আমি কাজ করতাম ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব মেন্টাল ইলনেস (NAMI)-র প্রবক্তা হিসেবে। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর হঠাত করেই সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর আবিস্কার করলাম যে, আমার নিজেরই একটা মানসিক বিপর্যয় চলছে। আমার মস্তিস্কের বাম পার্শ্বে একটা রক্তনালী ছিঁড়ে যায়। আর এরপর চারটা ঘন্টা আমি দেখলাম আমার মস্তিস্ক পুরোপুরি টালমাটাল হয়ে গেছে কোন তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ব্যাপারে। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের ঐ সকালে আমি হাঁটতে, কথা বলতে, পড়তে, লিখতে এমনকি আমার জীবনের কোন ঘটনা মনে করতেও পারছিলাম না। আমি যেন হয়ে গিয়েছিলাম একজন পূর্ণ বয়স্ক নারীর শরীরে একটা ছোট্ট শিশু।
আপনারা যদি কখনো একটা মানুষের মস্তিস্ক দেখেন তাহলে দেখতে পাবেন যে, এখানে দুইটা অংশ একে অপরের থেকে পুরোপুরিই আলাদা। আর আমি আপনাদের জন্য একটা সত্যিকারের মস্তিস্ক নিয়ে এসেছি। তো, এটা হচ্ছে একটা সত্যিকারের মনুষ্য মস্তিস্ক।
এইটা সামনের দিকের অংশ। আর এই পেছনের দিকে স্পাইনাল কর্ড ঝুলছে। এভাবেই এটা আমার মাথার মধ্যে বসানো থাকে। আর আপনি যদি এই মস্তিষ্কের দিকে তাকান, তাহলে স্পষ্টতই দেখতে পাবেন যে দুইটা সেরেব্রাল করটেক্স একে অপরের থেকে পুরোপুরিই আলাদা। আপনাদের মধ্যে যারা কম্পিউটারের কার্যপ্রণালী বোঝেন, আমাদের ডান অংশটা কাজ করে প্যারালাল প্রসেসরের মতো অন্যদিকে বাম অংশের তুলনা দেওয়া যায় সিরিয়াল প্রসেসরের সঙ্গে। এই দুইটা অংশ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে করপাস কোলোসামের মাধ্যমে। যেটা তৈরি হয়েছে ৩০০ মিলিয়ন এক্সোনাল ফাইবার দিয়ে। কিন্তু এছাড়া মস্তিস্কের এই দুইটা অংশ একে অপরের থেকে পুরোপুরিই ভিন্ন ধরণের। কারণ তারা তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে ভিন্নভাবে দুইটা অংশের চিন্তাধারাও পুরোপুরি ভিন্ন ধরণের তাদের কাজ করার জায়গাও ভিন্ন ধরনের। আর সাহস নিয়ে বললে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও আলাদা রকমের।
অনুগ্রহ করে, ধন্যবাদ। খুবই ভালো লাগল।
আমাদের মস্তিস্কের ডানদিকের অংশটার কাজকারবার সবকিছুই বর্তমান সময়টাকে নিয়ে। এর সবকিছুই "এখন এবং এই মুহূর্ত" নিয়ে। ডানদিকটা চিন্তা করে ছবির মাধ্যমে। সবকিছু শেখে কাইনেসথেটিক্যালি, আমাদের দেহের নড়াচড়া অনুযায়ী। এখানে ক্রমাগতভাবে তথ্য, শক্তিতরঙ্গ আকারে সমগ্র স্নায়ুতন্ত্রের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর তারপর এটা সুবিশাল একটা কোলাজ নিয়ে বিস্ফোরিত হচ্ছে এই বর্তমান মুহূর্তটা দেখতে কেমন, বর্তমান মুহূর্তটার গন্ধ কেমন? স্বাদ কেমন, এটার অনুভূতি কেমন, এটা শুনতে কেমন। আমি একটা শক্তিসত্তা রুপে সংযুক্ত আছি আমার চারপাশের সব শক্তিসমূহের সাথে, আমার এই ডান মস্তিস্কের সচেতনতা দিয়ে। আমরা একেকটা শক্তিসত্তা হিসেবে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত আছি একটা মনুষ্য পরিবার হিসেবে, এই ডান মস্তিস্কের সচেতনতা দিয়ে। আর এখন, এই মুহূর্তে এই দুনিয়ার আমরা সবাই ভাই ও বোন। এখানে এসেছি দুনিয়াটাকে আরও সুন্দর একটা জায়গা বানাতে। আর এই মুহূর্তে আমরা পরিপূর্ণ, আমরা একক, আর আমরা সুন্দর।
আমার বামদিকের অংশটা, আমাদের বামদিকের অংশটা পুরোপুরিই আলাদা জায়গা এটা চিন্তা করে রৈখিক ও পদ্ধতিগতভাবে এর কাজকারবার অতীত ও ভবিষ্যত নিয়ে। এটা তৈরি হয়েছে এমনভাবে যেন তা বর্তমানের বিশাল কোলাজটার ভার নিতে পারে সে প্রতিটা তথ্যের বিস্তারিত তথ্য, তার সম্প্রসারণ, এবং সেগুলোর আরও বিস্তারিত ব্যখ্যা হাজির করে। তারপর এটা সেই তথ্যগুলোকে শ্রেনীবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত করে। অতীতে আমরা যা শিখেছি, তার সঙ্গে এগুলোকে মেলায় ও তার উপর ভিত্তি করে ভবিস্যতে আমাদের কী কী সুযোগ তৈরি হয় সেগুলোর হিসাব করে। আমাদের বাম মস্তিস্কটা চিন্তা করে ভাষার মাধ্যমে। মস্তিস্কের এই অংশটাই সংযোগ তৈরি করে দেয় আমার অন্তর্জগত ও বর্হিজগতের এইটাই সেই আওয়াজ, যা আমাকে বলে, "শোন মনে রাখো তোমাকে বাড়ি ফেরার পথে কলা কিনে নিয়ে যেতে হবে। আর সকালে সেটা খেতে হবে।
এই হিসাবমাফিক বুদ্ধিমত্তাটাই আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, কখন আমাকে কাপড় কাচতে হবে। কিন্তু সম্ভবত তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই ছোট্ট কণ্ঠটাই আমাকে বলে যে, ”আমি আছি” ”আমি আছি”। আর যতক্ষণ আমার বাম মস্তিস্ক আমাকে বলে যে, ”আমি আছি”, আমি আলাদা হয়ে যাই। আমি হয়ে যাই একটা একক দৃঢ় ব্যক্তিসত্তা। আমার চারপাশের শক্তি প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই আপনাদের থেকেও। আমি আমার মস্তিস্কের এই অংশটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার স্ট্রোকের সেই সকালে
সেদিন সকালে আমি ঘুম থেকে উঠেছিলাম আমার বাম চোখের পেছনে প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে। পুড়ে যাওয়ার মত ব্যাথাটা সেইরকম যেমনটা আমাদের হয় ঠান্ডা আইসক্রিমে কামড় দিলে। ব্যথাটা আমাকে জাপটে ধরছে,-- আবার ছেড়ে দিচ্ছে। তারপর আবার জাপটে ধরছে, আবার ছেড়ে দিচ্ছে। আর এই ধরণের ব্যাথার অভিজ্ঞতা আমার জন্য ছিল খুবই অস্বাভাবিক। তো, আমি ভাবলাম, ঠিক আছে। আমি স্বাভাবিকভাবে আমার রোজকার রুটিন শুরু করি।
কাজেই আমি উঠলাম আর আমার কার্ডিও গ্লিডারে চড়ে বসলাম। এটা পুরো শরীরের ব্যায়ামের একটা যন্ত্র। আর আমি সেটাতে ব্যায়াম শুরু করার পর, উপলব্ধি করলাম, মেশিনের বারগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকা নিজের হাতগুলোকে আমার মনে হতে থাকল আদিম নখরযুক্ত পশুর হাতের মতো আমি ভাবলাম, “এটা খুবই অদ্ভুত।” নিচের দিকে পুরো শরীরের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, ‘ওয়াও! আমি একটা কিম্ভুত সদৃশ জিনিস।’ আমার চেতনা দুরে সরে যাচ্ছে আমার সাধারণ-- বাস্তবতার উপলব্ধি থেকে, যেখানে আমি সেই ব্যক্তি মেশিনের উপরে দাঁড়ানো এইসব অভিজ্ঞতার সম্মুখিন, রহস্যময় একটা যায়গায় যেখানে আমি নিজেই এইসব অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করছি
আর সবকিছু মিলিয়ে ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত, সেই সাথে আমার মাথাব্যাথা আরও চরম আকারে বাড়তে থাকল। তো, আমি মেশিন থেকে নেমে এলাম। বসার ঘরের মেঝেতে হাঁটাহাটি করতে লাগলাম। আর তখন আমি উপলব্ধি করলাম যে, আমার দেহের ভিতরের সবকিছুই খুব ধীরগতির হয়ে গেছে। আমার প্রত্যেকটা ধাপই পড়ছে খুব ধীরগতিতে এবং সুচিন্তিতভাবে। আমার গতির কোন প্রবাহ নেই, আর আমার উপলব্ধির ক্ষমতার জায়গাটা এতই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল, তো, আমি আমার অভ্যন্তরীন ব্যবস্থার দিকে মনোনিবেশ করলাম বাথরুমে এসে গোসলের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় আমি বাস্তবিকই আমার শরীরের ভিতরের কথাবার্তা শুনতে পেলাম আমি শুনলাম, একটা ছোট্ট স্বর বলছে, “ঠিক আছে। তুমি পেশি, তোমাকে শুরু করতে হবে। তুমি পেশি, তুমি আরাম কর।”
আর তারপর আমি আমার নিয়ন্ত্রণ হারালাম আর দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেলাম। আর আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম যে, আমি আর কোনভাবেই আমার দেহের সীমানা নির্ধারণ করতে পারছি না। মনে করতে পারছি না যে, আমার শুরু কোথায় আর শেষ কোথায়, কারণ মনে হচ্ছিল আমার হাতের অনু পরমানুগুলো মিশে গেছে দেয়ালের অনু পরমানুগুলোর সঙ্গে। আর একটা জিনিসই আমি সনাক্ত করতে পারছিলাম তা হলো একটা শক্তি -- শক্তি
আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, “আমার সমস্যা টা কী? কী হচ্ছে এসব?” আর এই মুহূর্তে আমার মস্তিস্কের কাথাবার্তা -- আমার বাম অংশের কথাবার্তাগুলো -- পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে গেল। যেন কেউ রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে মিউট বাটন চেপে দিয়েছে। পুরোপুরি শব্দহীন। আর প্রথমে আমি প্রথমবারের মতো নিজেকে একটা নিশ্চুপ মস্তিস্কের মধ্যে পেয়ে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর খুব দ্রুতই আমার চারপাশের শক্তির চমৎকারীত্বে মজেছিলাম। আর আমি যেহেতু আমার দেহের সীমানা নির্ধারণ করতে পারছিলাম না, তাই আমার নিজেকে বিশাল ও সুবিস্তৃত মনে হচ্ছিল। চারপাশের সব শক্তির সাথে নিজেকে একাত্ম মনে হচ্ছিল। আর সেটা ছিল খুবই সুন্দর অনুভূতি।
তারপর হঠাৎই আমার বাম মস্তিস্ক জীবিত হয়ে অনলাইনে আসল আর আমাকে বলল, “হেই! আমাদের সমস্যা হয়েছে। আমাদের সমস্যা হয়েছে। আমাদের সাহায্য নিতে হবে।” আর আমি শুরু হয়ে গেলাম, “আহ্হ্! আমার সমস্যা হয়েছে। আমার সমস্যা হয়েছে।” তো এটা এরকম, “আচ্ছা আচ্ছা। আমার সমস্যা হয়েছে।”
কিন্তু তারপরেই আমি আবার ডান মস্তিস্কের সচেতনতায় ফিরে গেলাম। আমি এই জগতটাকে আদর করে তাইরে নাইরে দুনিয়া বলতে পছন্দ করি। কিন্তু এটা ছিল খুবই সুন্দর। চিন্তা করেন, বাহ্যিক দুনিয়ার সাথে মস্তিস্কের যে কথোপকথনকারীটা আপনাকে সংযুক্ত রাখে, সেটা আপনার থেকে পুরোপুরিই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কেমন লাগতে পারে।
তো, এই জায়গায় থাকা আমার কাছে, আমার চাকরি চাকরি সংক্রান্ত যে কোন চাপ-দুশ্চিন্তা, সব হাওয়া হয়ে গেছে। আর আমার শরীরের মধ্যে নিজেকে খুব হালকা লাগছে। আর ভাবেন যে, বাহ্যিক দুনিয়ার সঙ্গে সব সম্পর্ক, সেগুলোর মধ্যকার চাপ দুশ্চিন্তার কথাগুলোও সব গায়েব হয়ে গেছে। আর আমি এই শান্তিপূর্ণ অবস্থাটা অনুভব করছি। একবার ভাবুন যে, ৩৭টা বছরের সব আবেগপূর্ণ লটবহর ঝেড়ে ফেলতে পারলে কেমন লাগত! (হাসি)। আমি খুবই ফুর্তিতে ছিলাম -- স্ফুর্তি। এটা খুবই সুন্দর একটা অনুভূতি ছিল
আর তারপর আবার আমার বাম মস্তিস্ক অনলাইনে চলে আসল আর বলল, "হেই! তোমাকে মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের সাহায্য নিতে হবে।” আর আমি ভাবছি, “আমাকে সাহায্য নিতে হবে। মনোযোগ দিতে হবে।” তো, আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। আর খুবই যান্ত্রিকভাবে পোশাক পরে হাঁটতে লাগলাম। ভাবছিলাম, ‘আমাকে কাজে যেতে হবে। কাজে যেতে হবে। আমি কি গাড়ি চালাতে পারব? গাড়ি চালাতে পারব?
আর এইসময় আমার ডানহাত পুরোপুরি প্যারালাইজড হয়ে গেল। তারপর আমি বুঝতে পারলাম, “ওহ! ঈশ্বর! আমার চৈতন্য লোপ (স্ট্রোক) হচ্ছে। আমার স্টোক হচ্ছে!”
আর তার পরের ঘটনা হলো, আমার মস্তিস্ক বলছে, “বাহ! এটা কী চমৎকার! (হাসি) এটা কী মজার! কতজন মস্তিস্ক বিজ্ঞানী নিজেই নিজের মস্তিস্কটা এভাবে ভেতর থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পায়?” (হাসি)
তারপরেই আমার মাথায় আসল যে, “কিন্তু আমি খুবই ব্যস্ত একটা মহিলা! (হাসি) আমার কোন স্ট্রোকের সময় নাই!”
তো, তারপরে ভাবলাম, “ঠিক আছে, আমি এই স্ট্রোক হওয়া আটকাতে পারব না। তো, এটা এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে সামলিয়ে তারপর আমি আমার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসব। ঠিক আছে, তাহলে আমাকে সাহায্য নিতে হবে। আমার অফিসে ফোন করতে হবে।” কিন্তু সেখানকার নাম্বারটা আমার মনে পড়ল না। তখন মনে হলো আমার অফিসে কিছু ভিজিটিং কার্ড আছে সেখানে আমার নম্বরটা লেখা আছে। তারপর আমি আমার কাজের ঘরে গেলাম, আর তিন ইঞ্চি মোটা কার্ডের বান্ডিলটা বের করলাম। আর আমি কার্ডের উপরের দিকে দেখলেও আমার বিজনেস কার্ডটা দেখতে কেমন, সেটা আমি মনের চোখে পরিস্কার দেখতে পেলেও আমি কিছুতেই বলতে পারছিলাম না যে, এটা আমার কার্ড কি না, কারণ আমি যা দেখতে পাচ্ছিলাম তার সবই শুধু পিক্সেল আর বর্ণগুলোর পিক্সেল মিশে যাচ্ছিল প্রতীকগুলোর পিক্সেল ব্যাকগ্রাউন্ডের পিক্সেলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল, আমি কিছুই বলতে পারছিলাম না তারপর আমাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে আমি যাকে বলি একটা 'স্পষ্টতার ঢেউ' এর জন্য আর তখন হয়তো আমি আবার স্বাভাবিক বাস্তবতায় পুনরায় সংযুুক্ত হতে পারছি। আর বলতে পারছি যে, এই কার্ডটা নয়। এই কার্ডটা নয়। এই কার্ডটা নয়। এভাবে তিন ইঞ্চি পুরু বান্ডিলটার এক ইঞ্চি পর্যন্ত যেতে আমার সময় লাগল ৪৫ মিনিট। আর এই ৪৫ মিনিটের মধ্যে আমার বাম মস্তিস্কের রক্তক্ষরিত অংশটা আরও বড় হয়েছে। আমি নাম্বার বুঝতে পারছি না। টেলিফোন বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমার এই একটা পরিকল্পনাই আছে। কাজেই আমি ফোন প্যাডটা নিলাম আর এখানে রাখলাম, বিজনেস কার্ডটা নিলাম, আমি এইখানে রাখলাম, আর এখন আমি কার্ডের হিজিবিজি আকৃতিগুলোর সঙ্গে মেলাতে থাকলাম ফোনপ্যাডের হিজিবিজি আকৃতিগুলোকে। কিন্তু তারপর আবার হয়তো আমি চলে গেলাম সেই তাইরে নাইরে দুনিয়ায়, পরে আবার সচেতন হয়ে আর মনে করতে পারলাম না যে আমি ইতিমধে্যই কোন নাম্বারের বোতাম চেপেছি। তাই (কোন পর্যন্ত চেপেছি এটা মনে রাখার জন্য) আমি প্যারালাইজড ডানহাতটাকে ফোনপ্যাডের ওপর রেখে একটা স্ট্যাম্পের মতো ব্যবহার করতে হলো যেন, আমি স্বাভাবিক বাস্তবতায় ফিরে আসার পরে বলতে পারি যে, “হ্যাঁ, আমি এই নাম্বারটা ইতিমধ্যেই ডায়াল করেছি।”
এভাবে, পুরো নাম্বারটা ডায়াল করা যখন শেষ হলো আমি ফোন ধরে শুনছি। আর আমার সহকর্মী ফোনটা ধরল আর বলল, “হুউ্ হুউ্ হুউ্ হুউ্” (হাসি)। আর আমি নিজে নিজে ভাবলাম, “ওহ! ঈশ্বর! তাকে একটা সোনালী শিকারী কুকুরের মতো শোনাচ্ছে!”
আর তারপর আমি তাকে বললাম আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি বললাম, “আমি জিল! আমার সাহায্য দরকার!” আর কথাটা আমার কানে শোনালো, “হুউ্ হুউ্ হুউ্ হুউ্” আমি ভাবলাম, “ওহ! ঈশ্বর! আমাকে একটা সোনালী শিকারী কুকুরের মতো শোনাচ্ছে!” চেষ্টা না করার আগ পর্যন্ত আমি বুঝতেই পারিনি, জানতামই না যে আমি ভাষা বলতে বা বুঝতে পারব না। কিন্তু সে বুঝেছিল যে, আমার সাহায্য লাগবে। আর সে তা করেওছিল।
তার কিছুক্ষণ পরে, আমি বস্টনের এক হাসপাতাল থেকে ম্যাসাচুসেটস-এর আরেকটা হাসপাতালে যাচ্ছিলাম অ্যাম্বুলেন্সে করে। আর আমি যেন একটা ছোট ভ্রুণের বলের মতো কুঁকড়ে গেলাম। যেন শেষ কিছু বাতাস নিয়ে উড়তে থাকা একটা বেলুন। আর ঐ সেই বেলুনের মতো, আমার মনে হলো, আমার শক্তি আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। মনে হলো, আমার আত্মা আত্মসমর্পণ করল
আর সেই মুহূর্তে, আমি জেনেছিলাম যে, আমি আর আমার জীবনের নির্দেশক নই। আর যদি চিকিৎসকেরা আমার দেহটা রক্ষা না করে ও আমাকে জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ না দেয় তাহলে এটাই হয়তো আমার পারাপারের মুহূর্ত।
সেই দিন দুপুরে যখন সজাগ হলাম, তখন এটা আবিস্কার করে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম যে, আমি এখনও বেঁচে আছি। যখন মনে হয়েছিল আমার আত্মা আত্মসমর্পন করছে তখনই আমি জীবনকে চিরবিদায় বলে দিয়েছিলাম। ি ভিন্ন বাস্তবতার জগত নিয়ে ফিরে এসেছে। স্নায়ুতন্ত্র বাহিত যেসব তরঙ্গ মস্তিস্কে আসছিল, সেগুলো মনে হচ্ছিল বিশুদ্ধ যন্ত্রণা। আলো আমার মস্তিস্ক যেন পুড়িয়ে দিচ্ছিল দাবানলের মতো। আর শব্দগুলোও এত জোরে আর বিশৃঙ্খল মনে হচ্ছিল যে, আমি ঐ চেঁচামেচি থেকে একটা স্বরও আলাদাভাবে সনাক্ত করতে পারছিলাম না। আমি শুধু চাইছিলাম পালিয়ে যেতে। কারণ আমি অন্য আরেকটা জগতে আমার দেহের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারিনি, নিজেকে মনে হয়েছিল বিশাল ও বিস্তির্ণ যেন একটা জ্বীন এই মাত্র প্রদীপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। আর আমার আত্মা উড়ে বেড়াচ্ছিল মুক্তভাবে। যেন একটা বিশাল তিমি সাঁতড়ে বেড়াচ্ছে শব্দহীন আনন্দময় সমুদ্রে। নির্বান আমি নির্বান লাভ করেছিলাম। আমি সেই চিন্তাটাও মনে করতে পারলাম যখন আমি ভেবেছিলাম আর কোনভাবেই এই সুবিশাল নিজেকে আমার এই ছোট্ট দেহটার মধ্যে ফেরাতে পারব না।
কিন্তু তারপরই আমি উপলব্ধি করলাম, “কিন্তু আমি এখনও বেঁচে আছি। এখনও বেঁচে আছি। আর আমি নির্বান প্রাপ্ত হয়েছি। আর যদি আমি নির্বান লাভ করে এখনও বেঁচে থাকতে পারি, তাহলে জীবন্ত অন্য সবাই-ই নির্বান লাভ করতে পারে। আর আমি এমন একটা দুনিয়ার ছবি কল্পনা করলাম যেটা সুন্দর, শান্তিপূর্ণ, করুনাময়, সৌহার্দপূর্ণ মানুষে পরিপূর্ণ, যারা সবাই জানে যে, তারা যে কোন সময়ে এই জগতটাতে আসতে পারে তারা ইচ্ছানুযায়ী মস্তিস্কের ডান অংশে আসতে ও এই শান্তি লাভ করতে পারে। আর তখন আমার উপলব্ধি হলো যে, এই অভিজ্ঞতাটা কী অসাধারণ একটা উপহার হতে পারে এই স্ট্রোকের অন্তদৃষ্টিটা কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে আমরা কীভাবে আমাদের জীবন ধারণ করব তা বুঝতে। এটাই আমাকে সুস্থ হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে।
আমার মস্তিস্কের রক্তক্ষরণের আড়াই সপ্তাহ পরে, চিকিৎসকেরা অপারেশন করে একটা গল্ফ বলের আকৃতির রক্তপিণ্ড বের করে যেটা আমার মস্তিস্কের ভাষা কেন্দ্রের দিকে চাপ দিচ্ছিল। এখানে, আমি আমার মা এর সঙ্গে, তিনি আমার জীবনের একজন সত্যিকারের দেবী। পুরোপুরি সুস্থ হতে আমার আট বছর লেগেছিল
তো, আমরা কে? আমরা হলাম এই বিশ্বব্রক্ষাণ্ডের জীবনী-শক্তি ক্ষমতা, দুইটা কার্জক্ষম হাত ও দুইটা সৃজনশীল মস্তিস্ক সমৃদ্ধ। আর আমাদের সেই ক্ষমতা আছে, প্রতিমুহূর্তে বেছে নেওয়ার যে, কিরুপে বা কিভাবে আমরা দুনিয়ায় বাঁচতে চাই। এখনই এইমূহূর্তে আমি সচেতনভাবে আমার ডানমস্তিস্কের জগতে পা রাখতে পারি। যেখানে আমরা আছি। আমি এই বিশ্বব্রক্ষাণ্ডের জীবনী-শক্তি ক্ষমতা। আমি এই ৫০ ট্রিলিয়ন চমৎকার অনুগুলোর জীবনী-শক্তি ক্ষমতা যা দিয়ে আমি গড়ে উঠেছি। এই পুরোটার সাথে আমি একাত্ম। বা আমি আমার বাম মস্তিস্কের সচেতনতায় প্রবেশ করতে পারি যেখানে আমি একটা একক ব্যাক্তিসত্তায় পরিণত হই, একটা নিরেট বস্তু। চারপাশের প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন, আপনাদের থেকে বিচ্ছিন্ন, আমি ড. জিল বোলটে টেলর: বুদ্ধিজীবী, স্নায়ুঅনুতাত্ত্বিক। আমার মাথার ভেতরে এই রকমের ‘আমরা’-রা আছি। আপনি কোনটা বেছে নেবেন? কোনটা বেছে নেবেন আপনি? আর কখন? আমি বিশ্বাস করি যত বেশি সময় আমরা ডান মস্তিস্কের গভীর আত্ম শান্তি লাভ প্রক্রিয়া চালাতে পারব তত শান্তিপূর্ণ জীবন আমরা দুনিয়াকে দিতে পারব। আর ততই বেশি শান্তিময় হবে আমাদের পৃথিবীটা।
You can share this video by copying this HTML to your clipboard and pasting into your blog or web page. This video will play with subtitles.
You either have JavaScript turned off or have an old version of the Adobe Flash Player. To view this rating widget you
need to get the latest Flash player.
If your browser allows only "trusted sites" to execute Javascript, you should add the "googleapis.com" domain to your whitelist to allow our Flash detection to work properly.
Got an idea, question, or debate inspired by this talk? Start a TED Conversation.
জিল বোলটে টেলর এমন একটা গবেষণার সুযোগ পেয়েছিলেন যা মস্তিস্ক বিজ্ঞানীদের কাছে স্বপ্নের মত। তাঁর একটা বড়ধরণের স্ট্রোক হয়েছিল, আর তিনি দেখছিলেন কিভাবে তার নিজের মস্তিস্কটা কাজ করছে। তাঁর চলাফেরা, কথা বলা. আত্ম সচেতনতা সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল একের পর এক। সে এক অসাধারণ কাহিনী।
Brain researcher Jill Bolte Taylor studied her own stroke as it happened -- and has become a powerful voice for brain recovery. Full bio »
Translated into Bengali by Partho Protim Das
Reviewed by Mohammad Tauheed
Comments? Please email the translators above.
23:34 Posted: Oct 2007
Views 2,125,347 | Comments 398
04:02 Posted: Mar 2008
Views 690,430 | Comments 137
22:18 Posted: Oct 2007
Views 519,680 | Comments 198
Just follow the guidelines outlined under our Creative Commons license.
This comment will be attributed to . Not ? Sign Out.